পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মৃত্যুর ভুয়া খবরটি মঙ্গলবার সকাল থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলেছে, যদিও কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র এর পক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। রওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা জেলে বন্দি অবস্থায় থাকা খানকে ‘জেলে বিষপ্রয়োগ করে হত্যা করা হয়েছে’ বা ‘লাশ গোপন করা হচ্ছে’—এমন দাবিগুলো এক্স প্ল্যাটফর্মে হাজারো পোস্টের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও উস্কে দিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে সকালে, যখন ইমরান খানের তিন বোন—আলেমা খান, উজমা খান এবং নুরিন খান—জেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যান। গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে সরকারের নির্দেশে এই দেখা নিষিদ্ধ ছিল। দেখা না করতে দেওয়ায় প্রতিবাদ করার সময় পুলিশ তাদের নির্মমভাবে আক্রান্ত করে, যাতে গুরুতর আঘাত লাগে। এই ঘটনার ভিডিও এবং ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়াতে শুরু করতেই সমর্থকদের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়: ‘যদি তিনি জীবিত থাকেন, তাহলে কেন দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না?’ এই প্রশ্ন থেকেই রুমারের জন্ম হয়েছে, যা দ্রুত ‘প্রুফ অফ লাইফ’—অর্থাৎ জীবিত থাকার প্রমাণ—দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভাইরাল হয়।
রুমারের মূল উৎস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে অ্যাফগান মিডিয়া আউটলেট ‘আফগানিস্তান টাইমস’, যারা দাবি করেছে যে একটি ‘নির্ভরযোগ্য সূত্র’ থেকে জানা গেছে, খানকে রহস্যময়ভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং লাশ জেল থেকে সরানো হয়েছে। এছাড়া, বালুচিস্তানের একটি বিচ্ছিন্ন গ্রুপ থেকে অভিযোগ উঠেছে যে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এবং সেনা প্রধান আসিম মুনির এতে জড়িত। এই দাবিগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি ভুয়া প্রেস রিলিজ, যাতে পাকিস্তান সরকারের অফিসিয়াল লোগো এবং স্বাক্ষর ব্যবহার করে ঘোষণা করা হয়েছে খানের মৃত্যু। ফ্যাক্ট-চেক সাইটগুলো এটিকে সম্পূর্ণ জাল বলে প্রমাণ করেছে, কারণ কোনো অফিসিয়াল বিবৃতি বা প্রমাণ নেই।
এক্স-এ এই খবরের ছড়ানো একটি চেইন রিয়্যাকশনের মতো হয়েছে। ২৫ নভেম্বরের শেষভাগ থেকে শুরু করে মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত ‘ইমরান খান ডেথ’, ‘মার্ডার্ড ইন জেল’ বা ‘পয়জনড’—এমন কীওয়ার্ডস দিয়ে হাজারো পোস্ট হয়েছে। এগুলোতে প্রোটেস্টের লাইভ ভিডিও, পুরনো ছবি এবং এমনকি এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট শেয়ার করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি পোস্টে আদিয়ালা জেলের বাইরে টর্চ মার্চের ভিডিও দেখানো হয়েছে, যা হাজারো ভিউ পেয়েছে। হ্যাশট্যাগ যেমন #ইমরানখান, #ফ্রি ইমরানখান বা #আদিয়ালাজেল দিয়ে এগুলো ট্রেন্ড করেছে, এবং পিটিআই-সমর্থী অ্যাকাউন্টস এবং আন্তর্জাতিক জিওপলিটিক্স হ্যান্ডেলস এটাকে ‘বম্বশেল’ বলে প্রচার করেছে। এমনকি কিছু পোস্টে অতিরঞ্জিত দাবি করা হয়েছে যে, এতে পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ হতে পারে বা ভারতের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দরকার। এই ধরনের রুমার আগেও ছড়িয়েছে, যেমন মে মাসে পয়জনিং-এর গুজব, যা পিটিআই-এর প্রচারণাকে শক্তি যোগায়।
ফ্যাক্ট-চেকাররা স্পষ্ট করেছে যে, এই খবরের কোনো ভিত্তি নেই—সূত্রগুলো অযাচাইকৃত, এবং পুরনো কনটেন্ট রিসাইকেল করা হয়েছে। পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, খানকে মেডিক্যাল চেকআপে নেওয়া হয়েছে এবং তিনি জীবিত। পিটিআই নেতারা স্বাধীন তদন্তের দাবি তুলেছেন, কিন্তু মৃত্যুর দাবিকে সমর্থন করেননি। ক্রিকেটার সহীল আফ্রিদির মতো ব্যক্তিরাও বুধবার জেলে দেখা করার চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন।
এই ফেক নিউজের ফলে আদিয়ালা জেলের বাইরে হাজারো সমর্থকের প্রোটেস্ট শুরু হয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়ও এটি কভারেজ পেয়েছে, যদিও সবাই এটিকে ‘অনির্ধারিত রুমার’ বলে চিহ্নিত করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন গুজব রাজনৈতিক প্রপাগান্ডার অংশ, যা অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে অস্থিরতা বাড়ায়। সতর্কতা হিসেবে বলা যায়, সোশ্যাল মিডিয়ার খবর শেয়ার করার আগে বিবিসি, আল জাজিরা বা রয়টার্সের মতো নির্ভরযোগ্য সূত্র চেক করুন, যাতে ভুল তথ্যের শিকার না হন।

